রমেক হাসপাতালে বদলি ঠেকাতে কর্মবিরতি

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রমেক) এ বরখাস্তকৃত ও বিভিন্ন অনিয়মের মুলহোতাখ্যাত দুজন কর্মচারীর বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর আংশিক সুবিধাভোগী কিছু কর্মচারী। একই সঙ্গে তারা দুপুর থেকে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. রুস্তম আলীর কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে।

বুধবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল থেকে কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির ব্যানারে ১৬ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা এ কর্মসূচি পালন করছে। অপরদিকে, সাধারণ কর্মচারীরা এ বদলির আদেশকে সাধুবাদ জানালেও তারা বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনে নামানোর অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, দীর্ঘ দিন রমেক হাসপাতালে পেশী শক্তি দেখিয়ে ডাক্তারদের রুম মেরামত, ডাষ্টবিন পরিস্কার, এসি মেরামত, হাসপাতাল ফ্রিজ, স্ট্যান্ড ফ্যান্, সিলিং ফ্যান, মাঠের গাছ বিক্রি, বিভিন্ন রিপিয়ারিং কাজ, বিদ্যুৎ সংস্কার, ব্লাড ব্যাংক, জরুরী বিভাগ, পুলিশের কেসের ডেড বডি, ৫ম তলার পত্তর শাখা, স্টাফ কোয়ার্টার দখল, সাধারণ কর্মচারীদের হয়রানীমূলক বদলি, সরকারি গাড়ী ব্যবহার, ওষুধ চুরি টেন্ডারবাজি, সাব-ঠিকাদারীসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ অবৈধভাবে করে আসছেন হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির সভাপতি মশিয়ার রহমান বকুল ও সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান নয়ন।

বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে গত দুমাসে জাতীয় দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও হত্যা মামলায় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির সকল নেতারা বরখাস্ত থাকা অবস্থায় চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে অবৈধভাবে মোটা অঙ্গের টাকা বিনিময়ে তামাশার নির্বাচন দেখিয়ে বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়ে যান। এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর পেশি শক্তির বলে হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারীদের জিম্মি করে নৈরাজ্য চালিয়ে আসছিল তারা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম ৩০-১২-২০ইং স্বাক্ষরিত স্বাঃঅধিপ্রশা-২/৪র্থ শ্রেণী বদলী-৬১/ঢাঃবিঃ/২০১৮/৪৯৬২/১(৯) স্মারকে রমেক পরিচালক বরাবর কঠোর ভাষায় অফিস আদেশ দেয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েয়ে এই আদেশ প্রশাসনিক কারণে জারী করা হইলো এবং আদেশ জারীর ৩ (তিন) দিনের মধ্যে বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদান করিতে হইবে অন্যথায় ৪র্থ দিনের দিন হইতে সরাসরি অব্যাহতি পাইয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে ইহাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন রহিয়াছে। এতে ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী আশিকুর রহমান নয়নকে পঞ্চগড় সিভিল সার্জন এর নিকট বদলী এবং মশিয়ার রহমান বকুলকে পরিচালক (স্বাস্থ্য) রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহীর নিকট বদলি করা হয়েছে।

এদিকে, বদলির ওই আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে কোনো ঘোষণা ছাড়াই আন্দোলনে নেমেছেন কর্মচারীরা। দাবি আদায়ে হাসপাতাল এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে আংশিক কর্মচারীরা। এসময় তারা আশিকুর রহমান রহমান ও মশিয়ার রহমান বকুলের বদলির আদেশ বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন  স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভ মিছিলটি ক্যাম্পাস এলাকা প্রদক্ষিণ শেষে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে।

কর্মবিরতিতে থাকা এক কর্মচারী নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, বরখাস্তকৃত কর্মচারী আশিকুর রহমান রহমান ও মশিয়ার রহমান বকুলকে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র বদলি করে দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই বদলি আদেশ তারা মানছেন না। এজন্য কর্মবিরতি পালন করেছে। আমাদের অনেককেই অনিচ্ছা স্বত্তে¡ও কর্মবিরতিতে আসতে হয়েছে। এসময় অনেকেই অভিযোগ করেছেন, আমাদেরকে হুমকি দিয়ে কর্মবিরতিতে নামানো হয়েছে।

এদিকে কোনো ঘোষণা ছাড়াই চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের এমন কর্মবিরতিতে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রæতই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

সুত্র জানায়, সাধারণ কর্মচারীরা এই বদলির আদেশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে, কিছু দিন আগে ৪র্থ শ্রেণীর কিছু কর্মচারীকে প্রমোশনের জন তদবির শুরু করেন নয়ন ও মশিয়ার। সেই মোতাবেক প্রমোশন বোর্ড গঠিত হয়। কিন্তু ৪র্থ শ্রেণীর কিছু কর্মচারীর অনৈতিক ক্ষমতা দেখানোর কারণে সেই প্রমোশন বোর্ড মিটিং বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরীর এক ক্ষমতায় ও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কিছু কর্মচারীকে নিজ বেতনে প্রমোশন দেয়া হয়।

এই কর্মচারীরাই বর্তমানে কর্মবিরতি পালন করছেন। এ অবৈধ আন্দোলনে সহযোগিতা করছেন, নিজ বেতন ২১জন হাসপাতালের কর্মচারী পিয়ন থেকে বড় পদে অবৈধ প্রমোশন নেয়া কর্মচারীরা। কারণ নয়ন মশিয়ার চলে গেলে তাদের অবৈধ নিয়োগ বাতিল হতে পারে এই ভয়ে তারা আন্দোলনে নেমে পড়েছেন। তাছাড়া ক’দিন আগে ডিজি অফিস থেকে এক কর্মচারীকে বদলি করে রমেক হাসপাতালে পাঠানো হলে তাকে হাসপাতালে ঢুকতে দেয়নি এই অবৈধ নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

জানা গেছে, এক দিনের ব্যবধানে নিজ বেতনে এমএলএসএস হামিদুল ইসলামের অফিস সহায়ক পদে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে জরুরি বিভাগের এমসি শাখার ইনচার্জ করে দেন। তার কাছ থেকে ভানুরাম হয়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা করে নয়ন ও মশিউরের কাছে আসে। এমএলএস আশরাফুল ইসলাম খোকনকে সর্দার পদে পদায়ন করে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে। এভাবেই ২১ জনের কাছ থেকে অর্ধকোটি হাতিয়ে নিয়েছেন নয়ন ও মশিয়ার।

এছাড়াও প্রতি মাসে ৫০টি ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রিজেনটিভদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে মাসে আড়াই লাখ টাকা আদায় করেন। হাসপাতালের ল্যাট্রিন থেকে বাড়তি হয় মাসে ৩০ হাজার টাকা। ৫টি কোয়াটার থেকে ভাড়া বাবদ অবৈধ আয় করেন মাসে ২০ হাজার টাকা। এছাড়াও হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন ভ্রাম্যমান হিসেবে ৩২টি দোকান বসে। তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫শ করে টাকা করে দিনে ১৬ হাজার টাকা আয় হয়।

এভাবেই বিভিন্ন খাত থেকে প্রতি মাসে তাদের আয় হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। মেডিকেল মোড়ের বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলো থেকে মোট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ১ জন করে প্রতিনিধি নিয়ে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি হাসপাতালে কিছু সংখ্যক আউট সোর্সিং এ জনবল নিয়োগের কথা বলে প্রায় ৫০ জনের কাছ থেকে (প্রতি জনের কাছ থেকে) ৫০ হাজার টাকা করে অবৈধভাবে ২কোটি ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। এভাবেই বিভিন্ন খাত থেকে প্রতি মাসে তারা সিন্ডিকেটে মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা আয় হয়।

আন্দোলনের বিষয়ে রমেক হাসপাতপালের বরখাস্তকৃত কর্মচারীও ৪র্থ শ্রেণী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান নয়নের মুঠোফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলে, তিনি ফোন রিসিফ করেননি। তবে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুস্তম আলী অফিস আদেশে বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শর্টলিংকঃ