ভেঙ্গে পড়েছে রমেক হাসপাতালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

বামে হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ ফরিদুল হক চৌধুরী,মাঝে সভাপতি মশিউর রহমান বকুল ও ডানে সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান নয়ন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (রমেক) এ সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে স্বাভাবিক কার্যক্রমের পুরো চিত্র উল্টে দিয়েছেন পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরী। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালটিতে।এতে করে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং এর পাশাপাশি রোগীসহ স্বজন ও সাধারণ কর্মচারীদের পোহাতে হচ্ছে অসহোনীয় দুর্ভোগ।

এদিকে, হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার আসামী ও বরখাস্তকৃত কর্মচারীদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে দিয়ে হাসপাতালের সবধরনের উন্নয়নমূলক, ঠিকাদারী কাজ করানো হচ্ছে তাদেরকে দিয়ে। এ কারণে প্রতি মাসেই নির্ধারিত কয়েকটি খাত থেকে অবৈধভাবে আয় হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এ অবৈধ টাকায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও নেতাদের ভাগ থাকায় একাজে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা বেশ আনন্দের সাথে সহযোগিতা করে আসছেন। আবার দীর্ঘদিন থেকে স্থগিত থাকা ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতি নির্বাচন দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাতিয়ে নিয়েছেন এককালীন অর্ধকোটি টাকা।

হাসপাতাল ও মামলা সুত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৩০ আগষ্ট রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৫জনকে আসামী করে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী খোরশেদা বেগম। যার মামলা নং ২২, তারিখ ৭/০৯/১৬ইং। জিআর নং ৫৫৭/১৬। পরবর্তীতে এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় এজাহারনামীয় আসামীসহ তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় মশিউর রহমান বকুল, আশিকুর রহমান নয়ন, শাহিনুর ইসলাম, আলী আহম্মেদ মজুমদার বাবু, মামুনুর রশিদ বিপ্লব, আব্দুর রউফ সরকারকে হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত করা হয়। এর পর থেকে রমেক হাসপাতাল ৪র্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী সমিতির কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে এ মামলার আসামীরা মহামান্য হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এসে কর্মচারী সমিতির ঝিমিয়ে পড়া কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে দমন করেন তৎকালীন পরিচালকবৃন্দ। কিন্তু রমেক হাসপাতাল পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরী যোগদানের পর থেকে আস্তে আস্তে হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজসহ ঠিকাদারী/সাব-ঠিকাদারী কাজের নিয়ন্ত্রণ নেয় ওই বরখাস্ত হওয়া গ্রæপটি। তারা চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি মাসে হাসপাতাল পরিচালককে অর্ধকোটি টাকা দিয়ে আইসিইউ ইনচার্জ জামাল উদ্দিন মিন্টুকে নির্বাচন কমিশনার বানিয়ে একটি তামাশার নির্বাচন করেন।

এ নির্বাচনে সাধারণ কর্মচারীরা মনোনয়নপত্র ক্রয় করলেও তাদের কাছ থেকে কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে ছিড়ে ফেলা হয়েছে। এতে বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় সভাপতি বানানো হয় হত্যা মামলার আসামী ও বরখাস্তকৃত কর্মচারী মশিউর রহমান বকুলকে ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আশিকুর রহমান নয়ন। বাকিরাও বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হন। এরপর শুরু হয় করোনা।

এ কারণে নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে কেউই মুখ খুলেনি। এদেরকে অনুমোদন দেয় ৪র্থ শ্রেণীর ১৭-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতি রংপুর জেলা শাখার সভাপতি আবু সাঈদ খান ও সাধারণ সম্পাদক মোজাহার হোসেন। অবাক করা কান্ড হচ্ছে বাংলাদেশের আর কোন সরকারি হাসপাতালে ৪র্থ শ্রেণীর ১৬-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতির কোন কমিটি নেই। শুধুমাত্র রমেক হাসপাতালে এ কমিটি রয়েছে।

সুত্র জানায়, হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত হয়েও তামাশার নির্বাচনে জয়লাভ এবং পরবর্তীতে ক্ষমতা গ্রহণসহ সবকিছুই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামীলীগ, বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠন ও জামায়াতিদের সমন্বয়ে তৈরি হয়ে বিশাল একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটটি হাসপাতালের সাধারণ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ক্ষমতার দাপটে দমিয়ে রেখে বর্তমান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ যেমন, ডাক্তারদের রুম মেরামত, ডাষ্টবিন পরিস্কার, এসি মেরামত, হাসপাতাল ফ্রিজ, স্ট্যান্ড ফ্যান্, সিলিং ফ্যান, মাঠের গাছ বিক্রি, বিভিন্ন রিপিয়ারিং কাজ, বিদ্যুৎ সংস্কার, বøাড ব্যাংক, জরুরী বিভাগ, পুলিশের কেসের ডেড বডি, ৫ম তলার পত্তর শাখা, সাধারণ কর্মচারীদের হয়রানীমূলক বদলি, সরকারি গাড়ী ব্যবহার, টেন্ডারবাজিসহ সাব-ঠিকাদারী কাজগুলো অতিরিক্ত মুল্যে করছেন। এতে করে সরকারের প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। সিন্ডিকেটটির উৎপাত ও তাদের অতিরঞ্জিত দাপটের কারণে সাধারণ কর্মচারীরাও রয়েছেন আতঙ্কে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রমেক হাসপাতালে দীর্ঘ দিন থেকে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যান্তরীন দ্ব›দ্ব ও ছোট বড় টেন্ডারবাজি নিয়ে কয়েকটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাবেক সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক আব্রাহাম লিংকন, মোখলেছুর রহমান, গেদরা শাহিন ও সোহেল। প্রতিটি হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ৪র্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী সমিতি রংপুর ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান রহমান নয়ন র‌্যাবের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। সে সময় অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়। ২০০৭ সালে একটি মামলায় ৭ বছর ও অপর একটি মামলায় ১০ বছর সাজা হয়। নয়ন সাজা ভোগ করার সময় কয়েদী হিসেবে চীফ রাইটার পদে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ইং সালে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের ঘটনায় আরও একটি মামলা হয়। সে মামলায় আশিকুর রহমান নয়ন ১নং আসামী। মামলাটিতে নয়ন ওয়ারেন্টভুক্ত হয়ে আছেন। মামলা নং এসআর ২০/১৮।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রমেক হাসপাতাল পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত সরকারী প্যাডে স্মারক নম্বর উল্লেখ পূর্বক কয়েকটি অফিস আদেশ ও বিল ভাউচারে বরখাস্তকৃত কর্মচারী আশিকুর রহমান নয়নসহ অন্যান্যদের নাম, পদবী, কর্মচারী সমিতির পদসহ কাজের ধরণ উল্লেখ করেছেন। (যা এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে) এতে করে হাসপাতাল এলাকায় দেখা দিয়েছে নানান গুঞ্জন। অনেকেই সমালোচনা করে বলছেন, মোখলেছুর রহমান হত্যাকান্ডের ঘটনার মামলাটি এখনও চলমান রয়েছে। আসামীরা বর্তমানে জামিনে আছেন।

সরকারি চাকরির বিধানবলী অনুযায়ী কোন সরকারি চাকরিজীবী ফৌজদারী অভিযোগে অভিযুক্ত হইলে ওই তারিখ হইতে সাময়িক বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হইবেন এবং বিচার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ ভাতা পাইবেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি লাভ করিলেও সাময়িক বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হইবেন। সাময়িক বরখাস্তের অর্থ হচ্ছে, কোন কর্মচারীকে সাময়িকভাবে কার্য সম্পাদনে, দায়িত্ব পালনে, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রয়োগে বিরত রাখা এবং কতিপয় সুবিধাপ্রাপ্তির অধিকার হইতে বঞ্চিত রাখা।

জানা গেছে, রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরী মোটা অঙ্কের টাকা বিনিময়ে সরকারি আদেশের সুস্পষ্ট লংঘন করে হত্যা, চাঁদাবাজী, ওয়ারেন্টভুক্ত ও এজাহারনামীয় আসামীদের নানাবিধ সুবিধা দিয়ে আসছেন। আরও জানা গেছে, হাসপাতালের অনিয়ন ও দুর্নীতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাওয়ায় কৌশলী ভুমিকা নিয়ে স্বেচ্ছায় আগাম অবসর গ্রহণের জন্য আবেদন করেছেন পরিচালক ফরিদুল হক চৌধুরী।

এদিকে, গত ১৩ই সেপ্টেম্বর ২০২০ইং রোববার জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক আমাদের কন্ঠের শেষের পাতায় “এজাহারভুক্ত আসামী ও হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত হয়েও হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা, রমেক হাসপাতাল কর্মচারী সমিতির নেতাদের কাছে জিম্মি রোগীসহ কর্মকর্তা কর্মচারীরা” শীর্ষক অনুসন্ধানীমূলক সংবাদ প্রকাশিত হলে টনক নড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সন্ত্রাসী নয়ন গ্রæপের। সাংবাদিকরা কিভাবে তথ্য পেল সে বিষয়টি নিয়ে সকল কর্মচারীর মোবাইল ফোন ও ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে তল্লাশি চালায়। সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয় মোবাইল ট্যাক করা হচ্ছে। এ কারণে সেখানে শুরু হয় ভিতিকর পরিস্থিতি। কেউ কারো সাথে ভয়ে কোন কথা বলে না।

জানা গেছে, চলতি মাসের ২০ তারিখে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে কলেজের ৪ লক্ষাধিক টাকার গাছ গোপনভাবে নিলামে ৭৮ হাজার টাকায় বিক্রির ঘটনায় তথ্য সংগ্রহের জন্য যুগান্তর ব্যুরো প্রধান মাহবুব রহমান গেলে তাকে অপহরণের চেষ্টা করে নিলামে গাছ ক্রয়কারী ব্যক্তির লোকজন। পরে তিনি অধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নেন। এ ঘটনায় তাৎক্ষনিকভাবে পুলিশ কমিশনারকে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানালে তারা এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ কাজের নিলামকারী ব্যক্তিও ওই সিন্ডিকেটের সদস্য।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সরকারি চাকরিজীবী জাতীয় পরিষদ ননক্যাডার ১০-২০তম গ্রেড এর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বিশ্বাস মুঠোফোনে জানান, বর্তমানে রমেক হাসপাতালে সরকারি কর্মচারী সমিতির নামে যে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে তা অবৈধ। তাদের সরকারি কোন অনুমোদন নেই। আমরা ওই সকল ভিত্তিহীন সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। এছাড়াও রংপুর মেডিকেল কর্মচারী সমিতিতে বর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারাতো বরখাস্তকৃত ও অস্ত্র এবং হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী। তারা হত্যা মামলার আসামী হওয়ায় সরকারি কোন কমিটির সদস্যও থাকতে পারবে না।

বাংলাদেশ ৪র্থ শ্রেণী ১৬-২০ গ্রেড সরকারি কর্মচারী সমিতি রংপুর ইউনিট শাখার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান নয়ন মুঠোফোনে জানান, আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। অস্ত্র মামলা থেকে আমি খালাস পেয়েছি আর বর্তমানে চলমান মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছি। কোন মামলায় আমার সাজা হয়নি, হাসপাতালে বিধিমোতাবেক কাজ করছি আর বেশি কাজ করছে ভুল হবেই।

নির্বাচন সম্পর্কে হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ও নির্বাচন কমিশনার জামাল উদ্দিন মিন্টুর মুঠোফোনে কয়েক দফা ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিফ করেননি। অর্ধকোটি টাকার বিনিময়ে স্থগিত থাকা নির্বাচন দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে হাসপাতাল পরিচালক ডা. ফরিদুল হক চৌধুরী বলেন, আমি অনেক ভুল করেছি। আশা করি পর্যায়ক্রমে তা ঠিক করে নিবো। আর বর্তমানে হাসপাতালে কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি হতে দিচ্ছি না।

শর্টলিংকঃ