বদলে গেছে করোনা টেস্টের নির্দেশনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১মার্চ, ২০২০ তারিখে করোনাকে মহামারী রূপে ঘোষণা দেয়। বিশ্বের প্রায় ২০০টিরও অধিক দেশে এই মহামারী ছড়িয়ে পডেছে। বাংলাদেশও এই মহামারীর ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাইনি। ৮ইমার্চ আমাদের দেশে প্রথম করোনার রোগী সনাক্ত হয়। বর্তমানে এই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১.৫ লক্ষ ছাড়িয়েছে। আক্রান্তের সাথে সাথে মৃত্যু সংখ্যাও বাড়ছে এবং সেটা ২০০০ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই ১৪/১৫ হাজার করোনা টেস্ট করা হচ্ছে যার মধ্যে ৩.৫ হাজার সনাক্ত হচ্ছে অর্থাৎ সনাক্তের হার প্রায় ২৩% যা আসলেই উদ্বেগের। তাই আমাদের এখনই সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমাদের আরো টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমরা যতো টেস্ট করবো ততো সহজেই আমরা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারবো।

প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর হতে আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনা টেস্ট এর পরীক্ষাও রিপোর্ট পেতে অনেকেই হয়রানির অভিযোগ করছেন। ৮/১০ দিনেও মিলছেনা টেস্ট এর রিপোর্ট। ফলে অনেক আক্রান্ত ব্যাক্তি সুস্থ হবার পরেও চাকরিতে যোগদান করতে পারছেন না, অনেকেই ভাড়া বাসায় উঠতে পারছে না এব্ং সামাজিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় পরতে হচ্ছে শুধু মাত্র দ্বিতীয় বার নেগেটিভ রিপোর্ট না থাকার   কারণে। তাই আমাদের সবাই কে করোনা টেস্টের বিষয়ে কিছু মৌলিক ধারনা রাখতে হবে।

করোনা টেস্ট: এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বব্যাপী ১ টি পরীক্ষাকেই করোনা শনাক্ত করার জন্যে gold standard অর্থাৎ আদর্শ বলে ধরা হচ্ছে আর সেটা হচ্ছে RT-PCR (Reverse transcriptase polymerase chain reaction).. সুতরাং যাদের এই টেস্ট পজিটিভ হবে তারাই করোনা রুগী হিসেবে শনাক্ত হবেন। তবে যদি কারো উপযুক্ত লক্ষণ থাকে সাথে রক্ত ও বুকেরী ঈঢজ পরীক্ষায় করোনার পক্ষে রিপোটর্ পাওয়া যায় তবে চঈজ টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ আসলেও প্রাথমিকভাবে করোনা আক্রান্ত রোগী হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। তবে এটির জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সুপ্তকাল:ইনকিউবেশন কাল অর্থাৎ যে সময়কাল কোন ভাইরাস মানুষের শরীরে থাকে কিন্তু তার কোন লক্ষণ দেখা যায় না, সেই ইনকিউবেশনের সময়টা কোভিড-১৯-এর জন্য হল ১৪ দিন পর্যন্ত – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে।কিন্তু কোন কোন গবেষক বলছেন এই সময়টা ২৪ দিন পর্যন্তও হতে পারে। অর্থাৎ জীবাণু আপনার শরীরে সুপ্ত অবস্থায় এই সময়কাল থাকতে পারে।তবে সাধারণত ভাইরাস শরীরে ঢুকলে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগে গড়ে চার থেকে পাঁচ দিন। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগতে পারে আরও বেশি দিন।

কখন টেস্ট করবেন: পূর্বে বলা হতো যদি কারো জ্বর,সর্দি, কাশি থাকে অথবা ১৪ দিনের মধ্যে করোনা আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে বা এমন কোনো জায়গা হতে আসা যেখানে করোনা সংক্রমণ বেশি অর্থাৎ রেড জোন হলে আপনাকে টেস্ট করতে হবে। তবে বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা হলো,যদি কারো জ্বরের সাথে কাশি,গলা ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকে তবে তিনি RTPCR টেস্ট করাবেন।

কিভাবে করা হয়: এখানে কোনো রক্ত নেয়া হয়না। swab stick দিয়ে নাকের অথবা গলার ভেতর থেকে ¯শ্লেশা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। কখন এবং কারা হসপিটালে ভর্তি হবেন: করোনা আক্রান্ত ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ রুগীর প্রাথমিক চিকিৎসা বাসায় করা হয়ে থাকে। শুধু মাত্র ১০ থেকে ১৫% ক্ষেত্রে হসপিটালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা প্রয়োাজন পড়ে। তবে কখন এবং কারা হসপিটালে ভর্তি হবেন এই বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা হলো:

১. জ্বর, সর্দি বা কাশীর সাথে সাথে যদি শ্বাস কষ্ট শুরু হয়।

২. আক্রান্ত ব্যাক্তি যদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার বা কার্ডিয়াক কোনো সমস্যায় ভোগেন।

৩. হটাৎ করে অজ্ঞান হলে বা মিনিটে ৩০বারের বেশি শ্বাস নিলে বা রক্তচাপ ৯০/৬০ এর বেশি কমে গেলে এবং বয়স যদি ৬৫ বছরের বেশি হয়।

৪. রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৪%এরকম হলে যা pulse oximeter দিয়ে নির্ণয় করা যায়।

তবে যদি কেউ শ্বাসকষ্ট ভোগেন,তিনি করোনা পজিটিভ না হলেও বা সন্দেহ ভাজন হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রের শর্ত: মার্চ মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রুগীর ছাড়পত্রের জন্য যেসব নিয়মাবলী নির্ধারণ করেছিলো তা হলো-

১. জ্বর সেরে গেল।

২. শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ/ সমস্যা জনিত উপসর্গ যেমন শুষ্ক কাশি/ কফ, নি:শ্বাসের দুর্বলতা -এগুলোর উন্নতি হলে।

৩. ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর দুটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ হলে।

৪. তবে দুটি আরটি-পিসিআর সম্ভব না হলে প্রথম দুটি মানদন্ড তিন দিন অব্যাহত থাকলে ছাড়পত্র দেয়া যাবে।

৫. হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও রোগীকে বাসায় বা অন্য কোথাও আইসোলেশনের নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং ছাড়পত্র পাওয়ার দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৪ দিন সেখানেই অবস্থান করতে হবে।

পরবর্তীতে সম্ভব হলে বাসায় থাকা অবস্থায় অথবা মনোনীত/নির্দেশিত জায়গায় উপস্থিত হয়ে রোগীর আরটি-পিসিআর পরীক্ষা জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা দেয়া যেতে পারে।

তবে বর্তমানে”২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর দুটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ হলে”এই শর্ত থেকে সরে এসেছে আইইডিসিআর। National guideline বা জাতীয় নির্দেশনা অনুযায়ীকরোনা আক্রান্ত ব্যাক্তির সুস্থতার যেসব শর্ত বর্তমানে অনুসরণ করা হয় তা হলো–

১. প্যারাসিটামল বা অন্যান্য কোনো জ্বরের ঔষধ ছাড়া কমপক্ষে ৩ দিন জ্বর মুক্ত থাকা।

২.পর পর ৩ দিনের মাঝে শ্বাস কষ্ট না হলে।

৩.হাসপাতালে ভর্তির রুগীর ক্ষেত্রে ছাড়া পাবার পর একটি নির্দিষ্ট সময় বাসায় আইসোলেশনের ব্যাবস্থা থাকা আর তা হলো প্রথম উপসর্গ দেখা দেয়া থেকে ২১দিন।

যুক্তিকতা:বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে কোন ব্যক্তি পজিটিভ শনাক্ত হবার পর সুস্থ  হয়ে উঠলে, তাকে নেগেটিভ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহের তারিখ থেকে মোট তের দিন পর্যন্ত হিসাবে গণ্য করা হবে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই হিসাব হবে ১৪ দিনের বলে নতুন গাইড লাইনে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে কারও জ্বর যদি ১৪ বা ১৫ দিনের মাথায় সে রে যায় তাহলে তার পরের তিন দিন যদি প্যারাসিটামল ছাড়া জ্বর না আসে তাহলে তখন থেকে অর্থাৎ ১৭/১৮ দিন থেকে তিনি সুস্থ বলে গণ্য হবেন। যেসব রোগী জটিল অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তাদের টেস্ট করা বা না করার পুরোবিয়টি সম্পর্কে হাসপাতালও চিকিৎসক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন।

কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হওয়ার পরেও টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসছে এবং আমাদের মাঝে বিভ্রান্তের উদ্রেক করছে। তাই এবিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

“মনে রাখতে হবে অনেক সময় মৃত ভাইরাসের  কারণে ও রোগীকে পজিটিভ দেখাতে পারে টেস্টে। সেক্ষেত্রে জ্বর থাকলে তাকে আইসোলেশনেই থাকতে হবে।তবে তার মধ্যে থাকা এই ভাইরাস অন্যদের সংক্রমিত করবে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।ফলেন নতুন করে টেস্টের প্রয়োজন নেই”।

বাংলাদেশে গত কিছু দিন ধরে ল্যাবরেটরি এবং টেস্টিং কিটের ঘাটতি দেখা দেয়ায় করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটিতে সংক্রমণের উচ্চহারের মুখে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার টার্গেটের কথা বলা হলেও এখন ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, কিট নয়, ল্যাবরেটরির অভাবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে জট  লেগে যাচ্ছে।একদিনে নমুনা পরীক্ষার পর অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছেন অন্যদিকে একজনের একাধিক পরীক্ষা করাতে গিয়ে অনেক কিটের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এখন পজিটিভ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় টেস্ট না করালে অনেক কিট সাশ্রয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লেখক: ডাঃ মোঃ মঞ্জুরুল হাসান, নাক, কান ও গলা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণরত, সহকারী সার্জন, এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর।

শর্টলিংকঃ