প্রধান মন্ত্রীর প্রণোদনা বনাম মূলধারার সাংবাদিক

যে মাধ্যম জনগণের চাওয়া-পাওয়া সমাজের নিকট তুলে ধরে আমার কাছে সেটাই গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের কারণেই আমরা মুহূর্তেই জানতে পারি দেশ-বিদেশে কখন কি ঘটছে। জানতে পারি কোথায় কি সমস্যা। শুধু জনগণই নয় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে থাকা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এই মাধ্যমের মাধ্যমেই জানতে পারে দেশের কোনটা বড় সমস্যা আর কোনটাইবা জরুরী। আর তাই আমি মনে করি সাংবাদিকতা একটি মহান ও একটি বিপদজ্জনক পেশাও বটে।

দেশে সকল সংকটময় মুূহূর্তে গণমাধ্যমকর্মীরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টাšন্ত সাস্প্রতিক করোনায় আক্রান্ত ‘সময়ের আলো’’র প্রধান প্রতিবেদক হুমায়ন কবির খোকনসহ অনেক মেধাবীর প্রাণ আকালে চলে যাওয়া। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট সকল দুর্যোগেই কিন্তু সাংবাদিকরাই থাকে সামনের সাড়িঁতে।

সাংবাদিকরা জেগে থাকলে, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকে তারাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বর্তমানে এই পেশাটি যেন কলঙ্কিত হয়ে পরেছে। এর জন্য দায়ী কিছু অসাধু সাংবাদিক। পেশাদারি সাংবাদিকতার অনেক ক্ষেত্রেই যাদের অনুপস্থিতি। তারা সৃষ্টিও করেছে গণমাধ্যমে নানা প্ল্যাটফর্ম। একেকটি প্ল্যাটফর্মে নিজেরাই নিজেদের যুগশ্রেষ্ঠ মনে করেন। মনে করেন তারাই মূলধারার সাংবাদিক। এরাই আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রূপ বদল করছেন! তাদের দাপটে প্রকৃত সাংবাদিকদের আজ এই পেশায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে।

কিছুদিন আগে গাইবান্ধায় করোনাকালীন প্রধান মন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার চেক নেয়া মূলধারার সাংবাদিকদের তালিকা দেখে আরেকবার বুঝলাম যে প্রকৃত সাংবাদিকদের কপাল ভালো না। প্রকৃত কথাটি যদিও মূলধারার বিপরীত শব্দ নয় তবুও মূলধারার সাংবাদিকদের অসমবন্টণ বা সমন্বয়হীরতার কারনে প্রকৃত কথাটি এখানে একেবারে বেমানান নয়। গাইবান্ধার সেই সকল সাংবাদিকদের (যারা নিজেদেরকে মূলধারার সাংবাদিক হিসেবে দাবী করেন) কাছে প্রশ্ন- আপনাদের তালিকা বহির্ভূত সাংবাদিকগণ তাহলে কোন ধারার সাংবাদিক?

বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একে একে নিয়েছেন প্রশংসনীয় সব উদ্যোগ। কিন্তু সে উদ্যোগ অসৎ কিছু মানুষদের কার্যকলাপে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না । গাইবান্ধার সংবাদ জগতে এর ব্যাতিক্রম নয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সাংবাদিক বান্ধব তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো তিনি দেরিতে হলেও সাংবাদিকদের প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে ভালো হতো, যদি এই প্রণোদনা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশের সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে করোনাকালীন মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রেস কাউন্সিলে পাঠানো হতো এবং সে অনুযায়ী বন্টন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে করোনাকালীন মাঠ পর্যায়ে সংবাদ কর্মীরা দুর্যোগ মুহুর্তের প্রণোদনা হতে বঞ্চিত হতোনা বলে আমি বিশ্বাস করি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট-এর নামে গোবিন্দগঞ্জের মানিক সাহা নামে এক যুবক গাইবান্ধার কিছু সাংবাদিক কে মুঠোফোনে কথা বলে মেইলে একটি ফরম পাঠিয়ে তা পূরন করে দিতে বলে এবং সে সাথে দুস্থ সাংবাদিকদের জন্য এই অনুদান দেয়া হবে বলে জানান। সেসময় কিছু সাংবাদিক এই সহায়তা প্রত্যাখান করলেও কিছু সংবাদকর্মী আশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্তু সেই আশা তাদের আশাই রয়ে গেল।

প্রশ্ন হচ্ছে প্রধান মন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার চেক সাংবাদিকদের মাঝে এটা কোন নিয়মে বন্টন? কেন মৌখিকভাবে এমন নির্দেশনা দিয়ে সরকার প্রধানকে বিতর্কিতকরা? এমন নিয়ম নীতির কথা সরকার প্রধানইবা কতোটা জানেন? কেন আজ প্রধান মন্ত্রীর অনুদানের চেক বিতরণের পর জেলার জেলায় বিক্ষোভ?

গাইবান্ধা জেলার একটি পরিসংখ্যান দেখানো যেতে পারে, যদি জেলার ০৭টি উপজেলার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতি উপজেলায় ২৫-৩০ জন সংবাদকর্মী কাজ করে। সে ক্ষেত্রে ধরে নেয়া যায় জেলায় অনুমানিক সাংবাদিকের সংখ্যা ১৭৫-২১০ জন। সেখানে প্রধান মন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার চেক জেলায় মাত্র ৪২ জন সংবাদকর্মীর তালিকা! তাও আবার এই ৪২ জন নাকি মূলধারার সাংবাদিক।

প্রধান মন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি আমার কাছে যতদূর মনে হয় প্রতিটি জেলায় মুষ্টিময় কিছু সাংবাদিক (যারা নিজেদের মূলধারার সাংবাদিক বলে দাবী করেন) তারাই সুবিধা ভোগ করছেন এবং প্রকৃত সংবাদ কর্মিরা হয়েছেন বঞ্চিত। তাই এমন নিয়ম-নীতির পরিবর্তনে প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রকৃত সংবাদ কর্মিরা।

সর্বোপরী আমাদের সাংবাদিকদের আস্থার প্রতীক এখনও কিছু নেতৃবৃন্দ রয়েছেন তাদের প্রতি আমার অনুরোধ প্রধান মন্ত্রীর আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করার অনুরোধ করছি। বিশ্বের এ ক্রান্তিকালে যেন প্রকৃত কোন সংবাদকর্মী যারা করোনার এই সংকটময় মুূহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করেছেন তারা কোনো ক্রমে বঞ্চিত না হয়। আমাদের এই দেশে বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আমরা যাকে মানবতার নেত্রী হিসেবে জানি, তার রাষ্ট্র পরিচালনার সময় প্রকৃত সাংবাদিকরা যদি অবহেলায় জীবন-যাপন করে তাহলে এটা দেখার দায়িত্ব কার?

লেখক : সাংবাদিক জাভেদ হোসেন, গাইবান্ধা । মোবাইল ফোন-০১৭০৪-৪৯০৭৬৭, ০১৯৭৫-৫০৯৬৯৬।

শর্টলিংকঃ