দোকানে সাইন বোর্ড দিয়ে বিক্রি হচ্ছে রেলের টিকিট

সরকারী ভাবে ট্রেনের টিকিট পুরোপুরি অনলাইন-নির্ভর হওয়ায় রাজশাহীতে সব টিকিট যাচ্ছে কালোবাজারে । ফলে রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে কমে গেছে যাত্রী। যাত্রীরা বলছেন, তাদের সবার কাছে স্মার্টফোন নেই। আবার যাদের আছে তারা রেলওয়ের ওয়েবসাইটে ঢুকে নিজেরা টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন না।

ফলে বাধ্য হয়ে তারা কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করছেন অতিরিক্ত দামে। আবার অনেকেই টিকিট কাটার ঝামেলা এড়াতে ট্রেনে ভ্রমণ না করে বিকল্প পথে যাতায়াত করছেন। রাজশাহীতে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান হলেও এই সিন্ডিকেটের দাপট একটুও কমেনি। ৬ আগস্ট নগরীর শিরোইল কাঁচাবাজার এলাকা থেকে দেড় লক্ষাধিক টাকার টিকিটসহ কালোবাজারি রিমন ও লিয়াকত হোসেনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

ভুক্তভোগী ট্রেনযাত্রীদেও অভিযোগ আগে স্টেশনে গিয়ে কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে তারা টিকিট সংগ্রহ করতেন। কিন্তু ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইন হওয়ায় পশ্চিম রেলওয়ের যাত্রীরা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, সান্তাহার, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঈশ্বরদী, খুলনা ও যশোর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলে এখন পুরোপুরি নির্ভর করছেন কালোবাজারিদের ওপর। অতিরিক্ত দাম দিয়েই তারা কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনছেন। মোবাইলে অনলাইনে কেটে সেই টিকিট স্টেশনের কাউন্টার থেকে প্রিন্ট নিতে হচ্ছে। এতে তাদের ভোগান্তিও বেড়েছে। এ ঝামেলার চেয়ে কাউন্টার থেকে সরাসরি টিকিট দিলেই বরং যাত্রীদের অনেক সুবিধা হতো। আবার টাকাও বাঁচত।

রাজশাহীর সাহেব বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, তিনি ব্যবসার কাজে কয়েক দিন পরপরই ঢাকায় যান। কিন্তু তার স্মার্টফোন থাকলেও তিনি নিজে চেষ্টা করে একবারও অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেননি। যতবারই টিকিট কাটতে অনলাইনে ঢুকেছেন তখনই টিকিট শেষ দেখিয়েছে। ফলে রাজশাহী- ঢাকার আন্তঃনগর বনলতার টিকিট বেশি দাম দিয়ে কিনেছেন। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী বলছিলেন, অনলাইনে ট্রেনের সব টিকিট দেয়ার ফলে বরং কালোবাজারিদের বেপোরোয়া হয়েছে। যারা পড়ালেখা জানেন না, তাদের পক্ষে কোনোভাবেই নিজে নিজে অনলাইন থেকে টিকিট সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে দালালদের দোকানে যেতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সব ট্রেনের টিকিট।

করোনায় বন্ধের পর ৩১ মে থেকে সীমিত আকারে ট্রেন চলাচল শুরু হলে সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। ক্রমে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও কাউন্টার থেকে আর টিকিট বিক্রি হয়নি। বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, খুলনা, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম স্টেশন থেকে বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। এসব ট্রেনের যাত্রীদের একমাত্র ভরসা দালাল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওষুধ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, সকাল ৬টা থেকে ট্রেনের চলতি ও অগ্রিম টিকিট অনলাইনে ছাড়া হয়। কিন্তু তিনি পূর্বপ্রন্তুতি নিয়েও একদিনও অনলাইন থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি। সকাল ৬টা ২ মিনিটেই টিকিট শেষ দেখিয়েছে। এ ব্যবসায়ী বলছেন, ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থায় কারসাজি ও চরম নৈরাজ্য চলছে। এখন কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি শুরু করা উচিত।

রাজশাহীতে অনলাইন টিকিট কালোবাজারিদের রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। তারা দোকানে সাইনবোর্ড দিয়েই টিকিট বিক্রি করছে। রাজশাহীর নিউমার্কেট, স্টেশনের আশপাশ, রেলগেট ও উপশহর নিউমার্কেট কেন্দ্রিক এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে অনলাইন কন্ট্রোল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণকারী রেলওয়ে বিভাগের কর্মীদের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। টিকিট বিক্রি শুরুর দুই মিনিটের মধ্যে শত শত টিকিট কেটে নেয়া বাস্তবে কোনোভাবেই সম্ভব না হলেও সিস্টেম কারসাজির কারণে তাই হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সিস্টেম কন্ট্রোল থেকে অধিকাংশ টিকিট বøক করার ফলে সাধারণ যাত্রীরা কেউই আর টিকিট কাটতে পারেন না। তবে কালোবাজারিদের দ্বারস্থ হলে তারা ঠিকই টিকিট কেটে দিচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা জানান এনআইডি অপশন বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়ার ফলে দালালদের বেশি সুবিধা হয়েছে।

এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, অনলাইনে টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্তটি মন্ত্রণালয়ের। অনলাইনে টিকিট সংগ্রহে যাত্রীদের কিছু অসুবিধার কথা তারাও শুনেছেন, কিন্তু কিছু করার নেই। এই বলেই ওনি খালাস তাহলে দায়বদ্ধতা কার!

শর্টলিংকঃ