প্রচারেই কাল

যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে শ্রমিকের প্রাণহানি হলেই আমরা দেখতে পাই তৎক্ষণাৎ মৃত ব্যাক্তির পরিবারকে কিছু নগদ অর্থ দিয়ে ফেসবুকে প্রচার করা হয়। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে মৃত ব্যক্তির সৎকার কিংবা দাফন-কাফন সঠিক ভাবে হয় কি না সে খবর আমরা ক’জনই বা রাখি ।

এমন ক্ষুদ্র অনুদান দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারনা একদিকে যেমন মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ছোট করা, অন্যদিকে সেই পরিবারটিকে অনিশ্চয়তার দিকেও ঠেলে দেয়া হয়। পাশাপাশি অন্ধকারে নিপতিত হচ্ছে সেই পরিবারের সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যৎ।

২০০৮ সালের ঢাকার কাকরাইলে আইরিশ নুরজাহান টাওয়ারে সংগঠিত দুর্ঘটনায় ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এই বিধান সর্বত্র কার্যকর করলে দুর্ঘটনা অবশ্যই হ্রাস পাবে এবং মৃত ব্যাক্তির পরিবার ও পরিবারের সন্তানদের অনাগত ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে ।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূণ কাজ হচ্ছে নির্মাণ শ্রমিকদের। আর এ কাজে নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলছে আহতের সংখ্যাও। অসহায় এবং অনিশ্চিত হচ্ছে তাদের পরিবার এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

সরকারি-বেসরকারি কিংবা মালিকানাধীন নির্মাণ সেক্টরে কর্তৃপক্ষের চরম খামখেয়ালিপনা, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সম্বন্ধে না জানার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। নির্মাণ শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে আমাদের । নির্মাণ শ্রমিকদের অনাকাক্সিক্ষত এমন দুর্ঘটনা ও মৃত্যু প্রতিরোধের বিষয়ে আমরা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবসময় নির্বিকার। দুর্ঘটনার পরে নজরদারীও থাকে না ভুক্তভোগী কিংবা মৃত শ্রমিক পরিবারের প্রতি।
নির্মাণ শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া তারা কোন কাজ করতে পারবেন না। নীতিমালায় এমন কথা উল্লেখ থাকলেও গাইবান্ধা জেলা শহরের বড় মসজিদ থেকে এসপি অফিসের সামনে পর্যন্ত ফোরলেন সড়ক তৈরির পূর্বে সড়কের পাশের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার কাজে তা সম্পূর্নভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

জেলা শহরের এই সড়কের দুইপাশে অধিগ্রহন করা জায়গা থেকে স্থাপনা সরিয়ে নিতে মাইকিং করে নির্দেশ দেয় গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। তাতে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সকল ব্যাবয়ীদের নিজ খরচে স্থাপনা অপসারনের কথা বলা হয়। স্থাপনা অপসারনের কথা মাইকিং করে ঘোষণা করলেও ভবন ভাঙ্গার নীতিমালার বিষয়ে মাইকে কোন কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আর তাই এমন দুর্ঘটনার জন্য অনেকেই মনে করেন সড়ক ও জনপথ বিভাগ এই দায় কিছুতেই এড়াতে পারেনা।
এই রাস্তায় একাধিক ভবন ভাঙ্গার কাজ ঘুরে দেখা গেছে, সবগুলো ভবন ভাঙ্গার কাজে বাংলাদেশ গেজেটভুক্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে নীতিমালা উপেক্ষা করে ভবন ভাঙ্গার কাজ করানো হচ্ছে। হেলমেট, গামবুট, নিরাপত্তা বেল্টসহ নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা। দেখে মনে হলো কর্মক্ষেত্রে এ যেন এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ।

সেখানে বিদ্যুতের তারগুলোও যেন মরন ফাঁদ। অথচ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ কিংবা ভবন মালিককে আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত বিভিন্ন কনভেনশন, ঘোষণা, রিকমন্ডেশন, দলিলের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কর্মস্থলে শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও ভবন ঝুঁকি চিহ্নিত করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্য ও ভবন ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

গাইবান্ধার সচেতন মানুষ মনে করেন বাংলাদেশ গেজেটভুক্ত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে নীতিমালা সকলের মানা উচিত আর এক্ষেত্রে ভবন মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সংবিধান নীতিমালার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তবেই আমরা এমন দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হবো।

প্রসঙ্গত গত ২ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা জেলা শহরে ফোরলেন সড়ক তৈরির জন্য সড়কের দু-পাশের স্থাপনা ভাঙার সময় পাকা দোকানঘরের বিম ভেঙে শ্রমিক আজাদ মিয়া ও আব্দুল ওয়াহেদ আলী নামে এক পথচারীর প্রাণ হারায়। সড়কের দুই পাশের এসব ভবন ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার সময় কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থাই গ্রহন করা হচ্ছেনা বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। ফলে আবারও কোনো ভবন বা স্থাপনা ভেঙে ফেলার সময় আরও কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানী ঘটতে পারে বলে আশংকা সচেতন মহলের। লেখক: সাংবাদিক, জাভেদ হোসেন, গাইবান্ধা, ফোন নং- ০১৭০৪-৪৯ ০৭ ৬৭ ।

শর্টলিংকঃ