কারাবন্দী সেই শিক্ষিকার স্বামী

কারাবন্দী মামুন

কলেজছাত্রকে বিয়ে করে সারা দেশে ব্যাপক ভাইরাল হওয়া নাটোরে গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর মোজাম্মেল হক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন। রোববার সকালে নাটোর শহরের বলারীপাড়ার ভাড়া বাসায় তিনি আত্মহত্যা করেন। তবে হত্যা না আত্মহত্যা বিষয়টি নিশ্চিত হতে আটক স্বামী মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয়রা জানান মামুন-নাহার দম্পতি নাটোর শহরের বলারীপাড়ার নান্নু মোল্লা ম্যানশনের চারতলায় ভাড়া থাকতেন। অনেকেই বলছেন, অসম বিয়ের কারণে এই শিক্ষিকার সঙ্গে সবাই খারাপ ব্যবহার, কথা না বলা, স্বামীর নেশাগ্রহণ ও ফেসবুকে মানুষের ক্রমাগত নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়েই তিনি আত্মহত্যা করেছেন।

ওই শিক্ষিকার ময়নাতদন্ত শেষে এ বিষয়ে নাটোর থানায় মামলা দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা।
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আব্দুল মোমিন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সামিউল ইসলাম শান্তর বরাত দিয়ে জানান, বিকাল ৪টার দিকে খায়রুন নাহারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। লাশের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। শ্বাসরোধ হওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, নাটোরের বলারীপাড়ার হাজী নান্নু মোল্লা ম্যানশনের ফটক নিয়মিত রাত ১০টায় বন্ধ হয়। শনিবার রাত ১১টার পর খায়রুন নাহারের স্বামী মামুন ভবনে প্রবেশ করেন। আবার রাত প্রায় আড়াইটার দিকে বেরিয়ে যান। এ সময় বাসার পাহারাদার নাজিম উদ্দিন তাকে এত রাতে বাহিরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে অসুস্থতার জন্য পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন বলে জানান।

পরে রোববার সকাল ৬টার দিকে মামুন বাসায় ফিরে আসেন। একটু পরেই তিনি বাসার পাহারাদারকে জানান তার স্ত্রী খায়রুন নাহার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওই বাসায় গিয়ে দেখতে পান বাসার বসার ঘরের মেঝেতে অধ্যাপিকার লাশ ।
বিষয়টি তার সন্দেহ হওয়ায় তিনি মামুনসহ কক্ষের দরজা বাহির থেকে আটকে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাসার মালিক নান্নু হাজীকে বিষয়টি জানান। বাসার মালিকের ছেলে তানভীর সিদ্দিকী এ সময় নাটোর থানায় ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানান।

সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় পৌর এলাকার মো. খয়ের উদ্দিনের মেয়ে। তার স্বামী মামুন হোসেন একই উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের পাটপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী মেম্বারের ছেলে ও নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

খায়রুন নাহারের সহপাঠী কলেজ শিক্ষক আমানুল ইসলাম আমান জানান, খায়রুন নাহার রাজশাহী কলেজে দর্শন বিষয়ে অনার্সে পড়ালেখা করার সময় রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার আড়ানী পান্নাপাড়ার সহপাঠী জহুরুল ইসলাম বাবলুকে বিয়ে করে। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবলু পান্নাপাড়া আব্দুর রহমান (বিএম) কারিগরি কলেজের শিক্ষক। এখন পর্যন্ত তার বেতন চালু হয়নি। তাদের সংসারে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া ১৭ বছরের একটি ছেলে এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। বেতন না হওয়ায় কলেজশিক্ষক জহুরুল ইসলাম বাবলু রডমিস্ত্রির কাজ করার পাশাপাশি প্রতি রোববার নাটোরের তেবাড়িয়া হাটে ইজারাদারের সহকারী হিসেবে খাজনা আদায়ের কাজ করেন।

জহুরুল ইসলাম বাবলু বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে সংসার ধরে রাখার অনেক চেষ্টা করলেও খায়রুন নাহার স্বামীকে তার বৃদ্ধা মা ও এলাকা ছেড়ে নাটোরে চলে আসার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এতে কাজ না হওয়ায় দুই বছর আগে তালাক দেন। তালাকের এক বছর পর ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় মামুনের সঙ্গে। মাস ছয়েক সম্পর্কের পর গত বছরের ১২ ডিসেম্বর কাজী অফিসে গিয়ে দুজন গোপনে বিয়ে করেন। এর ৬ মাস পর গত জুলাই মাসে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সারা দেশের সচেতন মানুষ ছাত্রকে শিক্ষিকার বিয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে হাজারও মন্তব্য করেন। তবে তখন বর ছাত্র মামুন জোরালোভাবে বলতে থাকেন- ভালোবাসার কোনো বয়স নেই, মন্তব্য কখনো গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তার এমন বক্তব্যও সারা দেশে ভাইরাল হয়। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকার করা আলোচিত এই ছাত্র-ম্যাডাম দম্পতির বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় আত্মহত্যার মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটল।

এর আগে শিক্ষিকা মোছা. খায়রুন নাহার জানিয়েছিলেন, আগের স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন তিনি ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকতেন। এর মধ্যেই এক বছর আগে ফেসবুকে তার সঙ্গে কলেজ ছাত্র মামুনের পরিচয় হয়। মামুনের সঙ্গে কথা বলে তিনি শান্তি অনুভব করেন। মামুন তার পাশে দাঁড়াতে চায়, সারা জীবন একসঙ্গে কাটাতে চায়। ৬ মাসে তাদের দুজনের মধ্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। একপর্যায়ে দুজন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বরে কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করায় ছেলের পরিবার মেনে নিলেও মেয়ের পরিবার থেকে বিয়ে মেনে নেয়নি। তাই নাটোর শহরে তারা ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, বিয়ের পর নিজের কর্মস্থলের কোনো সহকর্মী খায়রুন নাহারের সঙ্গে কথা বলতো না। আত্মীয়স্বজনরাও তাকে ত্যাগ করেছিল। এর মধ্যে অসম বয়সের বিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা কটূক্তি তাকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল।

মামুন ও তার স্ত্রী

স্বামী মামুনের বক্তব্য
রোববার সকালে পুলিশ মামুনকে আটক করে। আটকের সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে মামুন বলেন, খায়রুন নাহারের বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিওতে ১৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। এরই মধ্যে তার বাবার বাড়িতে থাকা বড় ছেলে ৬ লাখ টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। এসব বিষয়ে খায়রুন নাহার মানসিকভাবে খুবই চাপে ছিল।

তিনি দাবি করেন, শয়ন ঘরে স্ত্রীকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে তিনি ফজরের নামাজ পড়ার জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে রাত সাড়ে ৩টার সময় বাসা থেকে বের হন। এ সময় নামাজের জামাত কয়টায় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ফজরের জামাত ৪টায়, পরে বলেন সকাল সাড়ে ৫টায়!। নামাজের জন্য বাহিরে গিয়েছিলেন দাবি করলেও তিনি ফজরের নামাজ পড়েননি বলে স্বীকার করেছেন।

সকালে কলেজে যাওয়ার জন্য স্ত্রীকে ডেকে দিতে মোবাইলে কল দিলে স্ত্রী কল রিসিভ না করায় তিনি বাসায় ফিরেন। বাসায় ফিরে ড্রয়িং রুমে স্ত্রীকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখে হাতের কাছে কিছু না পেয়ে পকেটে থাকা গ্যাস লাইট দিয়ে ওড়নায় পুড়িয়ে স্ত্রীকে নামান। বুঝতে পারেন স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।

নিহত সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহারের চাচাতো ভাই সাবির উদ্দিন বলেন, অসম বয়সের বিয়ে হওয়ায় খায়রুন নাহারের কলেজের কোনো সহকর্মী তার সঙ্গে কথা বলতো না। বাবা-মাসহ আত্মীয়স্বজনরা যোগাযোগ রাখতো না। বিয়ের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় খায়রুন নাহার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।

তবে সাবির উদ্দিনের স্ত্রী নূরজাহান একই সময়ে বলেন, খায়রুন নাহারের স্বামী মামুন সবাইকে বলেছেন সকালের দিকে খায়রুন নাহার মারা গেছে, কিন্তু তিনি সকাল সাড়ে ৮টায় এসে দেখেছেন লাশের শরীর একেবারে শক্ত হয়ে আছে। অনেক আগে মারা গেলে যেমন শক্ত হয়ে যাওয়ার কথা ঠিক তেমনটা। খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছে এটাও তিনি মানতে রাজি নন।

নিহত খায়রুন নাহারের ভাতিজা নাহিদ হাসান বলেন, তার ফুফু খায়রুন নাহারের নতুন এই বিয়ের পর থেকেই মামুন তার ফুফুর কাছ থেকে পালসার মোটরসাইকেলসহ প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়েছে। নতুন করে আবার আরওয়ান-৫ মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার জন্য স্ত্রীকে চাপ দিচ্ছিল।
তিনি বলেন, মামুন নেশা করত। চার দিন আগে গুরুদাসপুরে নেশা গ্রহণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে খাইরুন নাহারের খালাতো ভাই ফারুক হোসেন, মামুনসহ কয়েকজনকে মারপিট করে ও কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় গুরুদাসপুর থানায় মামুনসহ কয়েকজনের নামে মামলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মামুন ও খায়রুন নাহারের মধ্যে কয়েক দিন থেকে মনোমালিন্য চলছিল। তবে গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল মতিন প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন সেই মামলায় মামুন অভিযুক্ত নয়।

খবর নেয়নি মামুনের কোনো স্বজন
বিয়ের পর সব মেনে নিলেও রোববার বউমা খায়রুন নাহারের মৃত্যু ছেলে মামুনের আটকের কোনো খবর নেয়নি মামুনের পরিবার। মামুনদের শহরের বাসা, মামুনকে আটক রাখার জায়গা নাটোর থানা, খায়রুন নাহারের ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে আসা নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও মামুনের কোনো স্বজনকে পাওয়া যায়নি।

তাদের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের পাটপাড়া গ্রামের বাড়িতেও পাওয়া যায়নি তার পিতা মোহাম্মদ আলী মেম্বারকে। তার পিতার মোবাইল ফোন ছিল বন্ধ। তার চাচা আহম্মদ আলী মেম্বারের মোবাইলে ফোন দিলে মামুনের চাচাতো বোন নিজের নাম-পরিচয় বলেন এবং এ বিষয়ে কোনো কথা বলতেও রাজি হননি।

এদিকে মামুনের গ্রামের সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন, মামুন ছোটবেলা থেকেই খুব বেপরোয়া। দীর্ঘ দিন থেকে নেশা করে। দুই বছর আগেও সে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সময় একই এলাকার গজেন ঘোষকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। সেই মোটরসাইকেল এখনো থানায় জমা আছে। তবে সেই মামলাটি ইতোমধ্যে মীমাংসা হয়েছে।

নাটোরের দুই পুলিশ সুপার যা বলেন
রোববার সকাল ১০টার পর প্রথমে নাটোরের পিবিআই পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন ও কিছু সময় পর নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা, সহকারী পুলিশ সুপার মহসিন ও নাটোর থানার ওসি নাছিম আহমেদসহ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় পিবিআই পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দিন বলেছেন, সব আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও তদন্ত অগ্রসর হলে এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা যাবে। এ মুহূর্তে এর চাইতে বেশি কিছু বলা মুশকিল।

নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেছেন, বিষয়টি আত্মহত্যার মতোই মনে হচ্ছে। সিলিং ফ্যানে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে যেভাবে ওড়না আগুন দিয়ে পুড়িয়ে খায়রুন নাহারকে তার স্বামী নামিয়েছেন এটা বিশ্বাসযোগ্য। তারপরও মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত স্বামী মামুন বাহিরে থাকাসহ সব পয়েন্ট মাথায় রেখেই পুলিশ তদন্ত কাজ শুরু করেছে। আশা করা যায় খুব শিগগিরই খায়রুন নাহারের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটন করতে সক্ষম হবে পুলিশ।

শর্টলিংকঃ